Best Bengali Patriotic Poems by Famous Poets 2025 l বিখ্যাত কবিদের লেখা বাংলা দেশপ্রেমের কবিতা সংগ্রহ

By raateralo.com

Updated on:

Best Bengali Patriotic Poems by Famous Poets 2025: বাংলা সাহিত্যে দেশপ্রেমের কবিতা এক চিরন্তন ধারা, যা স্বাধীনতার চেতনা, জাতীয়তাবোধ এবং বাঙালি গর্বকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। তাই পাঠকদের জন্য আমরা এনে দিলাম Best Bengali Patriotic Poems–এর একটি সমৃদ্ধ সংগ্রহ, যেখানে যুক্ত রয়েছে Bengali patriotic poems 2025, শতবর্ষের অনুপ্রেরণা জাগানো Famous Bengali patriotic poems, এবং প্রজন্মকে জাগিয়ে তোলা Bengali nationalist poems

এই বিশেষ Bengali patriotic poetry collection–এ আপনি পাবেন বাংলা স্বাধীনতার আবেগমাখা Bengali freedom poems, দেশ-মাটির প্রতি ভালোবাসায় পূর্ণ Bengali country love poems, হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া Bengali patriotic verses, এবং অসংখ্য বিখ্যাত Bengali poets patriotic poems। একই সঙ্গে আধুনিক ব্যঞ্জনায় ভরপুর Modern Bengali patriotic poetry, চিরায়ত সাহিত্য সৌন্দর্যে গড়া Classic Bengali patriotic poems, এবং ছাত্রছাত্রীদের জন্য উপযোগী Bengali patriotic poems for students–সহ একটি বিস্তৃত Bengali patriotic poem list

বাংলা দেশের প্রতি ভালোবাসাকে আরও গভীর করেছে Bengali nationalism poems, অনুপ্রেরণামূলক Bengali patriotic lines, বাংলা ভাষার সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা Bengali patriotic kavita, তীব্র আবেগে ভরপুর Bengali revolution poems, এবং স্বাধীনতার মূল্য মনে করিয়ে দেওয়া Bengali independence poems। দেশাত্মবোধের আলো ছড়ানোর পাশাপাশি সংকলনে রয়েছে Bengali inspirational patriotic poems, Bengali pride poems, এবং সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে তুলে ধরা Bengali culture patriotic poems

ভারত ও বাংলাদেশের মাটির প্রতি ভালোবাসার সেতুবন্ধনের জন্য যুক্ত হয়েছে Bangladesh and India patriotic poems–এর মনোমুগ্ধকর রচনা। পাঠকদের অনুপ্রাণিত করবে Bengali patriotic literature, হৃদয় ছুঁয়ে যাবে বাংলা দেশপ্রেমমূলক ছন্দ—বাংলা দেশপ্রেমের ছন্দ, বাংলা জাতীয়তাবোধের কবিতা, বাংলা স্বাধীনতা কবিতা, এবং চিরন্তন দেশপ্রেমমূলক উক্তি বাংলা

এই পুরো সংগ্রহ—Best Bengali Patriotic Poems—হলো দেশকে ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর সাহিত্যিক উপহার, যেখানে রয়েছে বিখ্যাত কবিদের বাংলা দেশপ্রেমের কবিতা, দেশাত্মবোধক কবিতা বাংলা, বাংলা দেশপ্রেমমূলক কবিতা সংগ্রহ, দেশপ্রেমের কবিতা ২০২৫, দেশাত্মবোধক কবিতা তালিকা, এবং সেরা দেশপ্রেম বাংলা কবিতা সংগ্রহ। যারা দেশপ্রেমের সত্যিকারের আবেগকে অনুভব করতে চান, তাদের জন্য এই সংকলনই হবে শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক।

Best Bengali Patriotic Poems by Famous Poets 2025 l বিখ্যাত কবিদের বাংলা দেশপ্রেমের কবিতা

ও আমার দেশের মাটি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ও আমার দেশের মাটি, তোমার ‘পরে ঠেকাই মাথা।
তোমাতে বিশ্বময়ীর, তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা ॥
তুমি মিশেছ মোর দেহের সনে,
তুমি মিলেছ মোর প্রাণে মনে,
তোমার ওই শ্যামলবরন কোমল মূর্তি মর্মে গাঁথা ॥
ওগো মা, তোমার কোলে জনম আমার, মরণ তোমার বুকে।
তোমার ‘পরে খেলা আমার দুঃখে সুখে।
তুমি অন্ন মুখে তুলে দিলে,
তুমি শীতল জলে জুড়াইলে,
তুমি যে সকল-সহা সকল-বহা মাতার মাতা ॥
ও মা, অনেক তোমার খেয়েছি গো, অনেক নিয়েছি মা–
তবু জানি নে-যে কী বা তোমায় দিয়েছি মা!
আমার জনম গেল বৃথা কাজে,
আমি কাটানু দিন ঘরের মাঝে–
তুমি বৃথা আমায় শক্তি দিলে শক্তিদাতা ॥

বাংলার মাটি বাংলার জল

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল–
পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান ॥
বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন, বাংলার মাঠ–
পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক হে ভগবান ॥
বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা–
সত্য হউক, সত্য হউক, সত্য হউক হে ভগবান ॥
বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন–
এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান ॥

হোক্‌ ভারতের জয়

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এসো এসো ভ্রাতৃগণ! সরল অন্তরে
সরল প্রীতির ভরে
সবে মিলি পরস্পরে
আলিঙ্গন করি আজ বহুদিন পরে।
এসেছে জাতীয় মেলা ভারতভূষণ,
ভারত সমাজে তবে
হৃদয় খুলিয়া সবে
এসো এসো এসো করি প্রিয়সম্ভাষণ।
দূর করো আত্মভেদ বিপদ-অঙ্কুর,
দূর করো মলিনতা
বিলাসিতা অলসতা,
হীনতা ক্ষীণতা দোষ করো সবে দূর।
ভীরুতা বঙ্গীয়জন-কলঙ্ক-প্রধান —
সে-কলঙ্ক দূর করো,
সাহসিক তেজ ধরো,
স্বকার্যকুশল হও হয়ে একতান।
হল না কিছুই করা যা করিতে এলে —
এই দেখো হিন্দুমেলা,
তবে কেন কর হেলা?
কী হবে কী হবে আর তুচ্ছ খেলা খেলে?
সাগরের স্রোতসম যাইছে সময়।
তুচ্ছ কাজে কেন রও,
স্বদেশহিতৈষী হও —
স্বদেশের জনগণে দাও রে অভয়।
নাহি আর জননীর পূর্বসুতগণ —
হরিশ্চন্দ্র যুধিষ্ঠির
ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ বীর,
অনন্তজলধিতলে হয়েছে মগন।

নাহি সেই রাম আদি সম্রাট প্রাচীন,
বিক্রম-আদিত্যরাজ,
কালিদাস কবিরাজ,
পরাশর পারাশর পণ্ডিত প্রবীণ।
সকলেই জল বায়ু তেজ মৃত্তিকায়
মিশাইয়া নিজদেহ
অনন্ত ব্রহ্মের গেহ
পশেছে কীর্তিরে শুধু রাখিয়ে ধরায়।
আদরে সে প্রিয় সখী আচ্ছাদি গগনে
সে লোকবিশ্রুত নাম
সে বিশ্ববিজয়ী ধাম
নির্ঘোষে ঘুষিছে সদা অখিল ভুবনে।
যবনের রাজ্যকালে কীর্তির আধার
চিতোর-নগর নাম
অতুলবীরত্বধাম,
কেমন ছিল রে মনে ভাবো একবার।
এইরূপ কত শত নগর প্রাচীন
সুকীর্তি-তপন-করে
ভারত উজ্জ্বল ক’রে
অনন্ত কালের গর্ভে হয়েছে বিলীন।
নাহি সেই ভারতের একতা-বিভব,
পাষাণ বাঁধিয়া গলে
সকলের পদতলে
লুটাইছে আর্যগণ হইয়া নীরব।
গেল, হায়, সব সুখ অভাগী মাতার —
ছিল যত মনোআশা
নিল কাল সর্বনাশা,
প্রসন্ন বদন হল বিষণ্ণ তাঁহার।
কী আর হইবে মাতা খুলিয়া বদন।
দীপ্তভানু অস্ত গেল,
এবে কালরাত্রি এল,বসনে আবরি মুখ কাঁদো সর্বক্ষণ।
বিশাল অপার সিন্ধু, গভীর নিস্বনে
যেখানে যেখানে যাও
কাঁদিতে কাঁদিতে গাও —
ডুবিল ভারতরবি অনন্ত জীবনে।
সুবিখ্যাত গৌড় যেই বঙ্গের রতন —
তার কীর্তিপ্রতিভায়
খ্যাতাপন্ন এ ধরায়
হয়েছিল একদিন বঙ্গবাসিগণ।
গেল সে বঙ্গের জ্যোতিঃ কিছুকাল পরে —
কোনো চিহ্ন নাহি তার,
পরিয়া হীনতাহার,
ডুবিয়াছে এবে বঙ্গ কলঙ্কসাগরে।
হিন্দুজনভ্রাতৃগণ! করি হে বিনয় —
একতা উৎসাহ ধরো,
জাতীয় উন্নতি করো,
ঘুষুক ভুবনে সবে ভারতের জয়।
জগদীশ! তুমি, নাথ, নিত্য-নিরাময়
করো কৃপা বিতরণ,
অধিবাসিজনগণ,
করুক উন্নতি — হোক্‌ ভারতের জয়!

আমার সোনার বাংলা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি ॥
ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে,
মরি হায়, হায় রে–
ও মা, অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি ॥
কী শোভা, কী ছায়া গো, কী স্নেহ, কী মায়া গো–
কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে।
মা, তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো,
মরি হায়, হায় রে–
মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি ॥
তোমার এই খেলাঘরে শিশুকাল কাটিলে রে,
তোমারি ধুলামাটি অঙ্গে মাখি ধন্য জীবন মানি।
তুই দিন ফুরালে সন্ধ্যাকালে কী দীপ জ্বালিস ঘরে,
মরি হায়, হায় রে–
তখন খেলাধুলা সকল ফেলে, ও মা, তোমার কোলে ছুটে আসি ॥
ধেনু-চরা তোমার মাঠে, পারে যাবার খেয়াঘাটে,
সারা দিন পাখি-ডাকা ছায়ায়-ঢাকা তোমার পল্লীবাটে,
তোমার ধানে-ভরা আঙিনাতে জীবনের দিন কাটে,
মরি হায়, হায় রে–
ও মা, আমার যে ভাই তারা সবাই, ও মা, তোমার রাখাল তোমার চাষি ॥
ও মা, তোর চরণেতে দিলেম এই মাথা পেতে–
দে গো তোর পায়ের ধূলা, সে যে আমার মাথার মানিক হবে।
ও মা, গরিবের ধন যা আছে তাই দিব চরণতলে,
মরি হায়, হায় রে–
আমি পরের ঘরে কিনব না আর, মা, তোর ভূষণ ব’লে গলার ফাঁসি ॥

যুগান্তরের গান

বলো ভাই মাভৈঃ মাভৈঃ
নবযুগ ওই এল ওই
এল ওই রক্ত-যুগান্তর রে।
বলো জয় সত্যের জয়
আসে ভৈরব-বরাভয়
শোনো অভয় ওই রথ-ঘর্ঘর রে॥
রে বধির! শোন পেতে কান
ওঠে ওই কোন্ মহা-গান
হাঁকছে বিষাণ ডাকছে ভগবান রে।
জগতে জাগল সাড়া
জেগে ওঠ উঠে দাঁড়া
ভাঙ পাহারা মায়ার কারা-ঘর রে।
যা আছে যাক না চুলায়
নেমে পড় পথের ধুলায়
নিশান দুলায় ওই প্রলয়ের ঝড় রে।
সে ঝড়ের ঝাপটা লেগে
ভীম আবেগে উঠনু জেগে
পাষাণ ভেঙে প্রাণ-ঝরা নির্ঝর রে।
ভুলেছি পর ও আপন
ছিঁড়েছি ঘরের বাঁধন
স্বদেশ স্বজন স্বদেশ মোদের ঘর রে।
যারা ভাই বদ্ধ কুয়ায়
খেয়ে মার জীবন গোঁয়ায়
তাদের শোনাই প্রাণ-জাগা মন্তর রে।


ঝড়ের ঝাঁটার ঝাণ্ডার নেড়ে
মাভৈঃ-বাণীর ডঙ্কা মেরে
শঙ্কা ছেড়ে হাঁক প্রলয়ংকর রে।
তোদের ওই চরণ-চাপে
যেন ভাই মরণ কাঁপে,
মিথ্যা পাপের কণ্ঠ চেপে ধর রে।
শোনা তোর বুক-ভরা গান,
জাগা ফের দেশ-জোড়া প্রাণ,
যে বলিদান প্রাণ ও আত্মপর রে॥
মোরা ভাই বাউল চারণ,
মানি না শাসন বারণ
জীবন মরণ মোদের অনুচর রে।
দেখে ওই ভয়ের ফাঁসি
হাসি জোর জয়ের হাসি,
অ-বিনাশী নাইকো মোদের ডর রে!
গেয়ে যাই গান গেয়ে যাই,
মরা-প্রাণ উটকে দেখাই
ছাই-চাপা ভাই অগ্নি ভয়ংকর রে॥
খুঁড়ব কবর তুড়ব শ্মশান
মড়ার হাড়ে নাচাব প্রাণ
আনব বিধান নিদান কালের বর রে।
শুধু এই ভরসা রাখিস
মরিসনি ভিরমি গেছিস
ওই শুনেছিস ভারত-বিধির স্বর রে।
ধর হাত ওঠ রে আবার
দুর্যোগের রাত্রি কাবার,
ওই হাসে মা-র মূর্তি মনোহর রে॥

শিকল-পরার গান

এই শিকল-পরা ছল মোদের এ শিকল-পরা ছল।
এই শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল॥

তোদের বন্ধ কারায় আসা মোদের বন্দি হতে নয়,
ওরে ক্ষয় করতে আসা মোদের সবার বাঁধন-ভয়।
এই বাঁধন পরেই বাঁধন-ভয়কে করব মোরা জয়,
এই শিকলবাঁধা পা নয় এ শিকলভাঙা কল॥
তোমার বন্ধ ঘরের বন্ধনীতে করছ বিশ্ব গ্রাস,
আর ত্রাস দেখিয়েই করবে ভাবছ বিধির শক্তি হ্রাস।
সেই ভয়-দেখানো ভূতের মোরা করব সর্বনাশ,
এবার আনব মাভৈঃ-বিজয়মন্ত্র বলহীনের বল॥

তোমরা ভয় দেখিয়ে করছ শাসন, জয় দেখিয়ে নয়;
সেই ভয়ের টুঁটিই ধরব টিপে, করব তারে লয়।
মোরা আপনি মরে মরার দেশে আনব বরাভয়,
মোরা ফাঁসি পরে আনব হাসি মৃত্যু-জয়ের ফল॥

ওরে ক্রন্দন নয়, বন্ধন এই শিকল-ঝঞ্ঝনা,
এ যে মুক্তি-পথের অগ্রদূতের চরণ-বন্দনা।
এই লাঞ্ছিতেরাই অত্যাচারকে হানছে লাঞ্ছনা,
মোদের অস্থি দিয়েই জ্বলবে দেশে আবার বজ্রানল॥

সর্বহারা

ব্যথার সাতার-পানি-ঘেরা
চোরাবালির চর,
ওরে পাগল! কে বেঁধেছিস
সেই চরে তোর ঘর?
শূন্যে তড়িৎ দেয় ইশারা,
হাট তুলে দে সর্বহারা,
মেঘ-জননীর অশ্র”ধারা
ঝ’রছে মাথার’ পর,
দাঁড়িয়ে দূরে ডাকছে মাটি
দুলিয়ে তর”-কর।।

কন্যারা তোর বন্যাধারায়
কাঁদছে উতরোল,
ডাক দিয়েছে তাদের আজি
সাগর-মায়ের কোল।
নায়ের মাঝি! নায়ের মাঝি!
পাল তু’লে তুই দে রে আজি
তুরঙ্গ ঐ তুফান-তাজী
তরঙ্গে খায় দোল।
নায়ের মাঝি! আর কেন ভাই?
মায়ার নোঙর তোল্‌।

ভাঙন-ভরা ভাঙনে তোর
যায় রে বেলা যায়।
মাঝি রে! দেখ্‌ কুরঙ্গী তোর
কূলের পানে চায়।
যায় চ’লে ঐ সাথের সাথী
ঘনায় গহন শাঙন-রাতি
মাদুর-ভরা কাঁদন পাতি’
ঘুমুস্‌ নে আর, হায়!
ঐ কাঁদনের বাঁধন ছেঁড়া
এতই কি রে দায়?

হীরা-মানিক চাসনি ক’ তুই,
চাস্‌নি ত সাত ক্রোর,
একটি ক্ষুদ্র মৃৎপাত্র-
ভরা অভাব তোর,
চাইলি রে ঘুম শ্রানি–হরা
একটি ছিন্ন মাদুর-ভরা,
একটি প্রদীপ-আলো-করা
একটু-কুটীর-দোর।
আস্‌ল মৃত্যু আস্‌ল জরা,
আস্‌ল সিঁদেল-চোর।

মাঝি রে তোর নাও ভাসিয়ে
মাটির বুকে চল্‌!
শক্তমাটির ঘায়ে হউক
রক্ত পদতল।
প্রলয়-পথিক চ’ল্‌বি ফিরি
দ’লবি পাহাড়-কানন-গিরি!
হাঁকছে বাদল, ঘিরি’ ঘিরি’
নাচছে সিন্ধুজল।
চল্‌ রে জলের যাত্রী এবার
মাটির বুকে চল্‌ ।।

ভারতবর্ষ, হোক আদর্শ (kobita) – ভবানীপ্রসাদ মজুমদার

ভারতবর্ষ তোমার-আমার—তোমার-আমার

বামুন-কায়েত, কুমোর-কামার, চাঁড়াল-চামার !

সবার মনে, গোপন কোণে, জাগাও হর্ষ

ভারতবর্ষ— ভারতবর্ষ— ভারতবর্ষ—

ভারতবর্ষ তোমার-আমার—তোমার-আমার

খেয়াল-ভজন, ঠুংরি-গজল, ধ্রুপদ-ধামার !

সবার প্রাণে, মিলন গানে, লাগাও স্পর্শ

ভারতবর্ষ— ভারতবর্ষ— ভারতবর্ষ—

ভারতবর্ষ তোমার-আমার—তোমার-আমার

মায়ের ভায়ের, বাবার কাকার, দাদার মামার !

সবার বুকে, দুঃখে-সুখে, হোক আদর্শ

ভারতবর্ষ— ভারতবর্ষ— ভারতবর্ষ—

ভারতবর্ষ তোমার-আমার—তোমার-আমার

খেত ও খামার, খনি-ধনী লোহা-পিতল-তামার !

তবুও হেন, দুঃখ কেন ? কেন বিমর্ষ ?

ভারতবর্ষ— ভারতবর্ষ— ভারতবর্ষ—

ভারতবর্ষ তোমার-আমার—তোমার-আমার

এখন সময় ওপরে ওঠার, নয়কো নামার !

জীবন লড়াই, বাঁচার বড়াই, নইলে ‘ফের-শো’

ভারতবর্ষ— ভারতবর্ষ— ভারতবর্ষ—

ভারতবর্ষ তোমার-আমার—তোমার-আমার

শপথ জোটার, সামনে ছোটার, নয়তো থামার !

নাও ন্যায়-নীতি, শুভেচ্ছা-প্রীতি, সুপরামর্শ

ভারতবর্ষ— ভারতবর্ষ— ভারতবর্ষ—

আমরা (বাঙালি) কবিতা – সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

মুক্তবেণীর গঙ্গা যেথায় মুক্তি বিতরে রঙ্গে

আমরা বাঙালী বাস করি সেই তীর্থে- বরদ বঙ্গে,

বাম হাতে যার কমলার ফুল, ডাহিনে মধুর-মালা,

ভালে কাঞ্চন-শৃঙ্গ-মুকুট, কিরণে ভূবন আলো,

কোল ভরা যার কনক ধান্য, বুকভরা যার স্নেহ,

চরণ পদ্ম, অতসী অপরাজিতায় ভূষিত দেহ,

সাগর যাহার বন্দনা রচে শত তরঙ্গ ভঙ্গে,

আমরা বাঙালী বাস করি সেই বাঞ্চিত ভূমি বঙ্গে।

বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করিয়া আমরা বাঁচিয়া আছি,

আমরা হেলায় নাগেরে খেলাই, নাগেরি মাথায় নাচি।

আমাদের সেনা যুদ্ধ করেছে সজ্জিত চতুরঙ্গে,

দশাননজয়ী রামচন্দ্রের প্রপিতামহের সঙ্গে।

আমাদের ছেলে বিজয়সিংহ লঙ্কা করিয়া জয়

সিংহল নামে রেখে গেছে নিজ শৌর্যের পরিচয়।

একহাতে মোরা মগের রুখেছি, মোগলের আর হাতে,

চাঁদ-প্রতাপের হুকুমে হঠিতে হয়েছে দিল্লীনাথে।

জ্ঞানের নিধান আদিবিদ্বান কপিল সাঙ্খ্যকার

এই বাঙ্গলার মাটিতে গাঁথিল সূত্রে হীরক-হার।

বাঙালী অতীশ লঙ্ঘিল গিরি তুষারে ভয়ঙ্কর,

জ্বালিল জ্ঞানের দীপ তিব্বতে বাঙালী দীপঙ্কর।

কিশোর বয়সে পক্ষধরের পক্ষশাতন করি,

বাঙালীর ছেলে ফিরে এল দেশে যশোর মুকুট পরি।

বাংলার রবি জয়দেব কবি কান্ত কোমল পদে

করেছে সুরভি সংস্কৃতের কাঞ্চন-কোকনদে।

স্থপতি মোদের স্থাপনা করেছে ‘বরভূদরের’ ভিত্তি,

শ্যাম কাম্বোজে ‘ওস্কার-ধাম’, -মোদেরি প্রাচীন কীর্তি।

ধেয়ানের ধনে মূর্তি দিয়েছে আমাদের ভাস্কর

বিট পাল আর ধীমান,- যাদের নাম অবিনশ্বর।

আমাদেরি কোন সুপটু পটুয়া লীলায়িত তুলিকায়

আমাদের পট অক্ষয় করে রেখেছে অজন্তায়।

কীর্তনে আর বাউলের গানে আমরা দিয়েছি খুলি

মনের গোপনে নিভৃত ভুবনে দ্বার ছিল যতগুলি।

মন্বন্তরে মরি নি আমরা মারী নিয়ে ঘর করি,

বাঁচিয়া গিয়েছি বিধির আশীষে অমৃতের টিকা পরি।

দেবতারে মোরা আত্মীয় জানি, আকাশে প্রদীপ জ্বালি,

আমাদেরি এই কুটীরে দেখেছি মানুষের ঠাকুরালি,

ঘরের ছেলের চক্ষে দেখেছি বিশ্বভূপের ছায়া,

বাঙালীর হিয়া অমিয় মথিয়া নিমাই ধরেছে কায়া।

বীর সন্ন্যাসী বিবেকের বাণী ছটেছে জগৎময়,

বাঙালীর ছেলে ব্যাঘ্রে বৃষভে ঘটাবে সমন্বয়।

তপের প্রভাবে বাঙালী সাধক জড়ের পেয়েছে সাড়া,

আমাদের এই নবীন সাধনা শব-সাধনার বাড়া।

বিষম ধাতুর মিলন ঘটায়ে বাঙালী দিয়েছে বিয়া,

মোদের নব্য রসায়ন শুধু গরমিলে মিলাইয়া।

বাঙালীর কবি গাহিছে জগতে মহামিলনের গান,

বিফল নহে এ বাঙালী জনম, বিফল নহে এ প্রাণ।

ভবিষ্যতের পানে মোরা চাই আশাভরা আহ্বাদে,

বিধাতার কাজ সাধিবে বাঙালী ধাতার আশির্বাদে।

বেতালের মুখে প্রশ্ন যে ছিল আমরা নিয়েছি কেড়ে,

জবাব দিয়েছি জগতের আগে ভাবনা ও ভয় ছেড়ে,

বাঁচিয়া গিয়েছি সত্যের লাগি সর্ব করিয়া পণ,

সত্যে প্রণমি থেমেছে মনের অকারণ স্পন্দন।

সাধনা ফলেছে, প্রাণ পাওয়া গেছে জগত-প্রাণের হাটে,

সাগরের হাওয়া নিয়ে নিশ্বাসে গম্ভীরা নিশি কাটে,

বিজয় গান

কাজী নজরুল ইসলাম

ওই অভ্র-ভেদী তোমার ধ্বজা
উড়ল আকাশ-পথে।
মা গো, তোমার রথ-আনা ওই
রক্ত-সেনার রথে॥
ললাট-ভরা জয়ের টিকা,
অঙ্গে নাচে অগ্নিশিখা,
রক্তে জ্বলে বহ্নিলিখা – মা!
ওই বাজে তোর বিজয়-ভেরি,
নাই দেরি আর নাই মা দেরি,
মুক্ত তোমার হতে॥
আনো তোমার বরণডালা, আনো তোমার শঙ্খ, নারী!
ওই দ্বারে মা-র মুক্তি সেনা, বিজয়-বাজা উঠছে তারই।

ওরে ভীরু! ওরে মরা!
মরার ভয়ে যাসনি তোরা;
তোদেরও আজ ডাকছি মোরা ভাই!
ওই খোলে রে মুক্তি-তোরণ,
আজ একাকার জীবন-মরণ
মুক্ত এ ভারতে॥

জন্মভূমি (কবিতা) – যতীন্দ্রমোহন বাগচী

যতীন্দ্রমোহন বাগচী

ঐ যে গাঁ-টি যাচ্ছে দেখা ‘আইরি’-ক্ষেতের আড়ে—

প্রান্তটি যার আঁধার-করা সবুজ কেয়াঝাড়ে,

পূবের দিকে আম-কাঁঠালের বাগান দিয়ে ঘেরা,

জটলা করে যাহার তলে রাখাল-বালকেরা—

ঐটি আমার গ্রাম— আমার স্বর্গপুরী,

ঐখানেতে হৃদয় আমার গেছে চুরি!

বাঁশবাগানের পাশটি দিয়ে পাড়ার পথটি বাঁকা,

পথের ধারে গলাগলি সজনে গাছের শাখা,

গোরুর গাড়ির চাকায় পথে শুকায় নাকো কাদা,

কোথাও বা তার বেড়ার পাশে আবর্জনার গাদা;—

তবু আমার জন্মভূমি স্বর্গপুরী,

বিশ্বশোভা ঐখানেতে গেছে চুরি!

যত দেশের যত পাখী ঐ গাঁয়ে কি আছে!

ঝোপে-ঝাড়ে বেড়ায় উড়ে বাসার কাছে কাছে;

পথের পাশে গাছের ডগা নুইয়ে পড়ে গায়ে,

চলতে গেলেই শুকনো পাতা মাড়াই পায়ে পায়ে;—

বনে-ভরা এমনি আমার স্বর্গপুরী,

তবু আমার চিত্ত সেথায় গেছে চুরি!

পদ্মদীঘি কোথায় পাব— পদ্ম নাইক মোটে,

চৈৎ-বোশেখে শুকিয়ে ওঠে, জলটুকু না জোটে!

পানায়-মরা ডোবায় ভরা, সিদ্ধি-গাছের ছাওয়া,

ভাঁট-পিঠিলির জঙ্গলেতে হাঁপিয়ে বেড়ায় হাওয়া—

এমনি আমার স্বর্গছাড়া স্বর্গপুরী,

স্বর্গশোভা তবু সেথায় গেছে চুরি!

পাঠশালাটিও নাইরে গাঁয়ে— নাই কোনো ডাকঘর,

কোথায় বদ্দি, যদিও কম্তি নয়কো বড় জ্বর;

রাজার প্রাসাদ নাইক সেথা, ধনীর দেবালয়,

সজ্জাহীনের লজ্জা নাইক, দারিদ্রের নাই ভয়;—

সৃষ্টিছাড়া এমনি আমার স্বর্গপুরী,

সকল অভাব তবু সেথায় গেছে চুরি!

তবু ওঠে কুমোর-পাড়ায় কদমতলার ধারে

সঙ্কীর্তনের মধুর-গীতি সান্ধ্য অন্ধকারে;

সবাই যেন স্বাধীন সুখী, বাধা-বাঁধন-হারা—

আবাদ করে, বিবাদ করে, সুবাদ করে তারা;

এমনি আমার সাদাসিধে স্বর্গপুরী,

তাইত আমার মনটি সেথায় গেছে চুরি।

শোভা বল, স্বাস্থ্য বল,— আছে বা না আছে,

বুকটি তবু নেচে ওঠে এলে গাঁয়ের কাছে;

ঐখানেতে সকল শান্তি, আমার সকল সুখ—

বাপের স্নেহ, মায়ের আদর, ভায়ের হাসিমুখ;—

তাইত আমার জন্মভূমি স্বর্গপুরী,

যেথায় আমার হৃদয়খানি গেছে চুরি।।

কবি-মাতৃভাষা (কবিতা) – মাইকেল মধুসূদন দত্ত

নিজাগারে ছিল মোর অমূল্য রতন
অগণ্য; তা সবে আমি অবহেলা করি,
অর্থলোভে দেশে দেশে করিনু ভ্রমণ,
বন্দরে বন্দরে যথা বাণিজ্যের তরী।
কাটাইনু কত কাল সুখ পরিহরি,
এই ব্রতে, যথা তপোবনে তপোধন,
অশন, শয়ন ত্যজে, ইষ্টদেবে স্মরি,
তাঁহার সেবায় সদা সঁপি কায় মন।
বঙ্গকূল-লক্ষ্মী মোরে নিশার স্বপনে
কহিলা – “হে বৎস, দেখি তোমার ভকতি,
সুপ্রসন্ন তব প্রতি দেবী সরস্বতী।
নিজ গৃহে ধন তব, তবে কি কারণে
ভিখারী তুমি হে আজি, কহ ধন-পতি?
কেন নিরানন্দ তুমি আনন্দ সদনে?

raateralo.com

Leave a Comment